মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. কে এম শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে মাদ্রাসার এমপিও নীতিমালা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি ও শিক্ষক হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি নিজের দপ্তরে ডেকে নিয়ে ১০ জন এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রিধারী মাদরাসা শিক্ষককে তিনি ইচ্ছামতো হয়রানি ও গালাগাল করেছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগী শিক্ষকদের দাবি, অভিযুক্ত উপপরিচালক তাদের হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘আমি যখন যাকে ইচ্ছা তাকে পদোন্নতি দেব, না চাইলে আপনারা ছয় মাস পরে পাবেন বা কখনো পাবেন না।’ একই সঙ্গে তিনি পেশাদারত্বের চেয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শকে প্রাধান্য দিয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলেও শিক্ষকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ আনা হয়েছে।
সম্প্রতি এমফিল-পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত মাদরাসা শিক্ষক ফোরামের শিক্ষকদের পক্ষ থেকে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বরাবর এক আবেদনে এ কর্মকর্তার শাস্তি চেয়েছেন তারা।
তবে উপ-পরিচালক ড. কে. এম শফিকুল ইসলাম দৈনিক আমাদের বার্তাকে বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ম মেনে কাজ করছি। এটা কারো পক্ষে গেছে আবার কারো বিপক্ষে গেছে। এ নিয়ে তারা অভিযোগ করেন। আপনারা যেকোনো থার্ড অ্যাঙ্গেল থেকে এসে দেখে যান। শিক্ষকরা বুঝতে পারছেন না। মন্ত্রণালয় আইন বানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কাছে আবার আমরা ব্যাখ্যা চেয়েছি। কিন্তু শিক্ষকরা বুঝছেন আমরা বোধহয় আটকে রাখছি। আসলে ব্যাপারটা সেরকম না। তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাওয়ার কারণে তারা আমার বিরুদ্ধে বলতেই পারেন। আপনারা একদিন প্যাক্টিক্যালি এসে দেখেন। এই বিষয়টি মন্ত্রণালয় থেকে যেভাবে নির্দেশনা দেবে আমরা সেভাবে এক্সিকিউট করবো।
জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জামায়াতের উচ্চ পর্যায়ের এক নেতার সুপারিশে সরকারি কলেজ থেকে মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে ডিডি পদে আসীন হন এই উপপরিচালক।
মাদরাসা শিক্ষকরা আবেদনে বলেন, চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (মাদরাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা, ২০২৬ প্রকাশিত হয়েছে। বিদ্যমান নীতিমালায় উচ্চতর গবেষণা হিসেবে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রিকে মূল্যয়ন এবং গবেষণা কর্মে শিক্ষকদের উৎসাহিত করে বিধি ১১.৪ ও পরিশিষ্ট-“ঘ” এর ক্রমিক ১-৪ এবং ক্রমিক ১০-১৪ এর আলোকে প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতিতে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতায় ‘এমফিল ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে ২ বছর এবং পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে ৪ বছর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা শিথিলযোগ্য’ করা হয়েছে।
নীতিমালার আলোকে মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে গত ৩০ মার্চ উপ-পরিচালক (অর্থ) ড. কে এম শফিকুল ইসলামের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকদের প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন আহ্বান করা হয় এবং এমফিল-পিএইচডির সার্টিফিকেট যাচাই করে পদোন্নতি দেওয়া হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। বিজ্ঞপ্তির আলোকে আমরা এমফিল-পিএইচডি ডিগ্রিধারীরা ২০২৬ এর মার্চে এমপিওতে পদোন্নতির জন্য আবেদন করলে ১৫ এপ্রিল নোটিশের মাধ্যমে ড. কে এম শফিকুল ইসলাম সব কাগজপত্র নিয়ে স্বাক্ষাতের জন্য তার অফিসে সকাল সাড়ে ৯টায় উপস্থিত হতে বলেন।
আমরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে তার অফিসে প্রত্যেকেই এককভাবে সাক্ষাৎ করি। সাক্ষাৎকারে তিনি আমাদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন ও আমাদের প্রত্যেকের ডিগ্রিকে খুবই নোংরাভাবে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে অফিস থেকে বের করে দেন। তিনি বলেন. আপনারা চাইলেই পদোন্নতি পাবেন না। আমি যখন যাকে ইচ্ছা তাকে পদোন্নতি দেব, না চাইলে আপনারা ৬ মাস পরে পাবেন বা কখনও পাবেন না।
আমরা একক সাক্ষাৎ শেষে সবাই মিলে তার কাছে গিয়ে বিধিমোতাবেক আমাদের পদোন্নতি দেওয়ার জন্য বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের সবার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে বের করে দেন। আমরা তার অপেশাদার আচরণে ব্যথিত হয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাই। পরে জানা যায়, তিনি ৩ জন এমফিল ডিগ্রিধারীকে পদোন্নতি দিয়েছেন। বাকিদের ফাইল বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে রিজেক্ট করেন। আর ২৬ এর ফেব্রুয়ারিতে পদোন্নতি পাওয়া দুজন ডিগ্রিধারী শিক্ষককে কোনো কারণ ছাড়াই তিনি ডিমোশন দেন। তারা দুজন অফিসে এসে সাক্ষাৎ করলে তাদের সঙ্গে তিনি অত্যন্ত খারাপ আচরণ করেন।
গত এপ্রিলে পদোন্নতির জন্য আমরা আবার ১০ জন ডিগ্রিধারী শিক্ষক আবেদন করি। যথারীতি সাক্ষাতের জন্য তার সঙ্গে যোগযোগ করলে তিনি নোটিশ না দিয়ে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা দিয়ে ১০ মে সাক্ষাতের জন্য ডিজি অফিসে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেন। ১০ মে সাক্ষাতেও তিনি একই ধরনের আচরণ করেন এবং বলেন, আমি এ নীতিমালাই মানি না। আপনারা কীভাবে পদোন্নতি পান আমি দেখে নেব। আমরা সবাই তার কথায় স্তম্ভিত হই। এখন শোনা যাচ্ছে, আমরা পদোন্নতিতে যাতে ২, ৪ বছর শিথিলতা না পাই, সে লক্ষ্যে নবনিযুক্ত পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) ও নব নিযুক্ত মহাপরিচালককে বিভিন্ন ন্যারেটিভ বুঝিয়ে ২, ৪ বছর শিথিলতার বিষয়টি রিভিউয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো ব্যবস্থা করেছেন, যা নীতিমালা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা বলে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সাত ধরনের অভিযোগ শিক্ষকরা এনেছেন এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সেগুলো হলো- স্বেচ্ছাচারিতা ও সর্বস্তরের শিক্ষক, অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, ক্ষমতার অপব্যবহার, পদোন্নতি প্রার্থীদের বঞ্চিত করা, কোনো প্রকার কারণ ছাড়া ডিমোশন দেওয়া. অশালীন ভাষা ব্যবহার, এমফিল-পিএইচডি ডিগ্রিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা এবং পেশাদারিত্বের চেয়ে রাজনৈতিক মতাদর্শকে প্রাধান্য দেওয়া।
#মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর #পদোন্নতি
Leave a Reply